শূন্য থেকে শিখরে ওঠার এক মহাকাব্য মারিয়া মান্দার


  >অধিনায়কত্বের অভিষেকেই সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও উঠেছে তাঁর হাতে। নতুন ভূমিকায় মাঝমাঠের প্রাণ মারিয়া মান্দার শুরুটা হয়েছে দারুণ। খেলায় নিয়ন্ত্রণ রাখা, বল সঠিকভাবে বণ্টন করা যাঁর কাজ।

বাংলাদেশের জার্সি গায়ে মাঝমাঠ সামলানোই এখন যাঁর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। কিন্তু এই ট্রফি, করতালি আর আলোর ঝলকানির পেছনের গল্পটা মোটেও সহজ ছিল না। এটি মূলত এক লড়াকু মা আর অদম্য মেয়ের শূন্য থেকে শিখরে ওঠার মহাকাব্য।

গতকাল জওহরলাল নেহেরু স্টডিয়ামে ম্যাচসেরার ক্রেস্ট হাতে নিয়ে মিক্সড জোনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মারিয়া। আনিকার ১১ সেকেন্ডের গোলটির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘প্রথম ম্যাচে ৩ পয়েন্ট পেয়েছি, খুব ভালো একটা শুরু হয়েছে। আনিকার শুরুর ওই গোল আমাদের মানসিকভাবে অনেক এগিয়ে দিয়েছিল। দেশবাসীর কাছে অনুরোধ, আপনারা যেভাবে পাশে আছেন, সব সময় থাকবেন।’

ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার পাহাড়ঘেরা, সবুজে মোড়া এক গ্রাম মন্দিরগোনা। এই গ্রামেই জন্ম মারিয়া মান্দার। তিনি গারো সম্প্রদায়ের মেয়ে। গারো সমাজ থেকে তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ারে সরাসরি কোনো বাধা আসেনি।

কিন্তু গ্রামীণ রক্ষণশীল সমাজ থেকে হাফপ্যান্ট পরে মেয়েদের ফুটবল খেলা নিয়ে ধেয়ে আসত কটূক্তি। সেই সময় পাশে দাঁড়িয়েছিলেন কলসিন্দুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কোচ মফিজ উদ্দিন এবং শিক্ষিকা মিনতি রানী শীল। তাঁরা প্রতি সপ্তাহে অভিভাবকদের মিটিং ডেকে বোঝাতেন, মেয়েদের খেলার সুযোগ দেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরতেন। তাঁদের হাত ধরেই মূলত কলসিন্দুর গ্রামে নারী ফুটবলের এক নীরব বিপ্লব শুরু হয়েছিল।

মারিয়াদের এই অভাবের গল্প বিশ্বজুড়ে উন্মোচিত হয় ‘অদ্যম মেয়েরা’ প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে। প্রথম আলোর প্রথিতযশা সাংবাদিক, সাহিত্যিক আনিসুল হক যখন একাধিকবার তাঁদের গ্রামে যান, মারিয়া তাঁর কাছে গ্রামে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানান। তাঁর উদ্যোগেই মারিয়াদের বিদ্যুৎহীন অন্ধকার গ্রামে প্রথম আলোর রোশনাই জ্বলে ওঠে। রাষ্ট্রীয় নজর এবং প্রথম আলোর বৃত্তির সহায়তা মারিয়ার স্বপ্নের পথকে আরও পোক্ত করে।

>ফুটবল মারিয়ার জীবনে আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। ফুটবলের উপার্জনে মারিয়া গ্রামে কিছু জমি কিনেছেন। মেজ বোনের অন্যের বাসায় কাজ করা বন্ধ করে বাড়ির পাশে একটি মুদিদোকান করে দিয়েছেন। ছোট ভাইয়ের জন্য তৈরি হয়েছে নতুন ঘর। সবচেয়ে বড় তৃপ্তি, মারিয়া তাঁর মাকে আর দিনমজুরের কাজ করতে দেন না।

যদিও ঘরে বসে থাকতে ভালো লাগে না বলে মা মাঝেমধ্যে মাঠে চলে যান। একসময় যে গ্রামবাসীরা কটূক্তি করতেন, আজ মারিয়া বাড়ি ফিরলে তাঁরা ফুল হাতে গেট সাজিয়ে বরণ করে নেন। সংবর্ধনার মঞ্চে বসে মারিয়া মায়ের চোখে যে গর্বের আলো দেখেছিলেন, তা ছিল মেঘেঢাকা আকাশে সূর্যের দেখা পাওয়ার মতো।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post